রুদ্রাক্ষ সবার জন্য নয়
জিজ্ঞাসু :— প্রণাম মহারাজ। রুদ্রাক্ষ ধারণ ও জপের কোন মাহাত্ম আছে? স্বামী পরমানন্দজী রুদ্রাক্ষ ধারণ ও তার বৈজ্ঞানিক কোন ব্যাখ্যা আলোচনা করেছেন? অনুগ্রহ করে জানাবেন।
জয়দীপ মহারাজ :— রুদ্রাক্ষকে বলা হয় শিবের অশ্রু। শিবের অশ্রু কোন দুঃখের কান্না নয়, এটা আনন্দাশ্রুর প্রতীক। মূলত হিমালয় অঞ্চলে রুদ্রাক্ষ গাছ পাওয়া যায়। পৃথিবীর অন্যান্য স্থানে সাধারণত রুদ্রাক্ষ গাছ পাওয়া যায় না। রুদ্রাক্ষ গাছ লাগালেও সব জায়গায় ফল হয় না। রুদ্রাক্ষের অনেক উপকারিতা আছে। রুদ্রাক্ষ নিয়ে অনেক বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা হয়েছে। রুদ্রাক্ষের বীজ প্রায় এক জ্যান্ত প্রাণ। মনুষ্য দেহের সংযোগে এটা বহুদিন সক্রিয় থাকে। রুদ্রাক্ষের মালা শরীরে ধারণ করলে এটা চারপাশের নেগেটিভ এনার্জি থেকে প্রতিরোধ গড়ে তুলে আমাদের সুরক্ষা দেয়। রুদ্রাক্ষের মধ্যে অনেক আধ্যাত্মিক শক্তি এবং ঔষধি গুণ আছে। আধ্যাত্মিক বৈশিষ্ট্যের মধ্যে মনঃসংযোগের সুবিধা হয়, ধ্যান করতে সুবিধা হয়, এক ধরনের আত্মসচেতনতা জাগে এবং মনকে অন্তর্মুখী করতে খুব সাহায্য করে। রুদ্রাক্ষের মালার কর গুনেই হোক অথবা রুদ্রাক্ষ ধারণ করেই হোক, সাধনা ও তপস্যা করার ক্ষেত্রে রুদ্রাক্ষ খুব সহায়ক হয়। ঔষধি গুণের দিক দিয়ে দেখলে বলা হয় রুদ্রাক্ষ হার্টের পক্ষে এবং উচ্চ রক্তচাপের পক্ষে খুবই ভালো। রুদ্রাক্ষ শরীরকে স্থির রাখে, শ্বাস-প্রশ্বাস সংযমিত করে, হার্টবিটকে নিয়ন্ত্রণে রাখে, মানসিক চাপ সামলাতে ও অবসাদ দূর করতে সাহায্য করে।
নানা রকমের রুদ্রাক্ষ আছে। সবচেয়ে বেশি পাওয়া যায় পঞ্চমুখী রুদ্রাক্ষ। এছাড়া চতুর্মুখী, ত্রিমুখী, দ্বিমুখী ও একমুখী রুদ্রাক্ষ আছে। একমুখী রুদ্রাক্ষ খুবই বিরল। এর উপকার অনেক বেশি। বলা হয় একটি একমুখী রুদ্রাক্ষ সাথে থাকার অর্থ শিবকে সঙ্গে রাখা। সব রুদ্রাক্ষেরই কমবেশি গুণ আছে। তবে একমুখী রুদ্রাক্ষের প্রভাব শরীরে, মনে, স্বভাবে ও চেতনায় অনেক বেশি পড়ে।
গুরুমহারাজ জোর দিয়ে বলেছেন যে রুদ্রাক্ষ তারাই ব্যবহার করবে যারা ব্রহ্মচর্য জীবন যাপন করবে। সবার জন্য রুদ্রাক্ষ ধারণ করা মোটেও বাঞ্ছনীয় নয়। বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে গৃহীরাও রুদ্রাক্ষ ধারণ করতে পারে। যে সকল গৃহী যৌন সংসর্গ ত্যাগ করেছে, যারা গার্হস্থ্য জীবন যাপন করলেও সেভাবে যৌন কর্মে লিপ্ত হয় না, যারা সাধনা ও তপস্যায় মন দিয়েছে, তাদের পক্ষে রুদ্রাক্ষ ধারণ করা যেতে পারে। দ্বিতীয়ত, রুদ্রাক্ষ ধারণ করার সময় গুরু, সাধু ও মহাত্মার অনুমতি নেওয়াই বাঞ্ছনীয়। নইলে রুদ্রাক্ষ ব্যবহারের জন্য তার কিছু অসুবিধা বা ক্ষতি হতে পারে। তৃতীয়ত, রুদ্রাক্ষ গাছ হচ্ছে ব্রহ্মচারী গাছ। শাস্ত্রে এমনও বলা হয়েছে যে রুদ্রাক্ষ গাছ লাগানোর সময় কোন ব্রহ্মচারীর হাত দিয়েই রোপণ করা উচিত। নইলে সাধারণ কোন মালী লাগালে সেই গাছ না হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি থাকে। কোন সাধক বা ব্রহ্মচারী যদি গাছ লাগান এবং পরিচর্যা করেন তবেই সেই গাছের স্বাভাবিক বৃদ্ধি হবে।
স্পষ্টতই, রুদ্রাক্ষের মধ্যেই ব্রহ্মচর্য ও সংযমের কনসেপ্ট রয়েছে। বর্তমানে রুদ্রাক্ষ নিয়ে যেহেতু খুব বাণিজ্যিকীকরণ চলছে তাই ঋষিকেশ, হরিদ্বার থেকে শুরু করে বহু জায়গায় সরকারি সার্টিফিকেট দেখিয়ে রুদ্রাক্ষ বিক্রি হচ্ছে। অনেকে ভদ্রাক্ষ নামে একটি অনুরূপ ফলকে রং করে রুদ্রাক্ষ বলে বাজারে চালাচ্ছে। অনেক নামকরা সাধু নিজের আশীর্বাদ দিয়ে রুদ্রাক্ষ বিক্রি করছেন। বিক্রির সময় বলছেন যে যৌন সংসর্গ করার সময় রুদ্রাক্ষের মালা পাশে খুলে রেখে দাও, পরদিন আবার ধারণ করো। এগুলো একেবারেই বৈজ্ঞানিক নয়, এতে ক্ষতি হয়। এতে রুদ্রাক্ষের উপকারও পাওয়া যায় না, আর যৌন সংসর্গের তৃপ্তিও হয় না। অনেকে ভাবে যে রুদ্রাক্ষ ধারণ করা মাত্রই তাৎক্ষণিক কাজ শুরু হয়ে গেল এবং যেই খুলে ফেলা হলো অমনি সে আগের মতো হয়ে গেল, তা কিন্তু নয়। দীর্ঘদিন রুদ্রাক্ষ পরলে শরীরের মধ্যেকার প্রবাহমান কারেন্টের উপর রুদ্রাক্ষের প্রভাব পড়ে। তাই রুদ্রাক্ষ পরার ব্যাপারে সৎ হতে হয়। সবকিছুর পণ্যকরণ ভালো নয়। রুদ্রাক্ষকে এখন ফ্যাশনের অঙ্গ করে তোলা হয়েছে। গলায়, কবজিতে সৌখিন সাজে রুদ্রাক্ষ জড়িয়ে কুম্ভ মেলার সাধুদের নকল করে কিছুটা চমক সৃষ্টি করার প্রচেষ্টা চলছে। এটা মোটেও ভালো নয়। কিছু কিছু জিনিসের অধিকার ও মর্যাদা বুঝতে হয়। গ্রামের কোন সাধারণ মানুষ আচমকা গলায় স্টেথিস্কোপ ঝুলিয়ে ঘুরে বেড়ালে নিশ্চয়ই ভালো লাগবে না। লোকে তাকে ডাক্তার ভেবে ভুল করবে, অথচ ডাক্তারির হাতেখড়িও হয়নি তার।
আমি ব্যক্তিগতভাবে দোকানে গিয়ে রুদ্রাক্ষ কেনা পছন্দ করি না। আমাদের দেশে পরম্পরাগতভাবে চিরকালই কোন না কোন সাধু কৃপা করে কাউকে রুদ্রাক্ষ দিয়েছেন। কাউকে দেখে হয়তো তাঁর মনে হয়েছে যে এর রুদ্রাক্ষ প্রয়োজন। তিনি নিজে থেকে তাকে ডেকে বলেছেন, তুমি এই রুদ্রাক্ষটি ধারণ করবে। বিনিময়ে তিনি কোন অর্থ নেন না। এই রুদ্রাক্ষেই কাজ হবে। সংগীত, চাষবাস, বিদ্যা, ম্যাজিক এবং অন্যান্য যত গুরুমুখী বিদ্যা, আধ্যাত্মিক শক্তি ও আধ্যাত্মিক পরম্পরা আমাদের দেশে রয়েছে, সেগুলো নিয়ে যখনই ব্যবসা করা শুরু হয়েছে তখনই সেই শক্তির হ্রাস হয়েছে। এতে আমাদের সংস্কৃতি পঙ্কিল হয়েছে। তাই কোন সাধু যদি অযাচিতভাবে কাউকে শিবলিঙ্গ, রুদ্রাক্ষ বা অন্যকিছু দেন তাহলে বুঝতে হবে এটা ভগবানের ইচ্ছাতে তার কাছে এসে পৌঁছেছে। সেটাকে পরীক্ষা করাতে কোথাও নিয়ে যেতে হবে না, প্রয়োজনে গুরুর নাম করে, ঠাকুর ঘরে কিছুক্ষণ রেখে দিন। তারপর মনে মনে সেটাকে শুদ্ধ ভেবে নিয়ে ধারণ করলেই আপনার জীবনে অভূত ফল দিতে বাধ্য। এই ভাবেই আমাদের দেশে রুদ্রাক্ষ মানুষের কাছে পৌঁছেছে।
বর্তমানে অনেক রুদ্রাক্ষ টেস্টিং সেন্টার তৈরি হয়েছে। অনেকে কম্পিউটারের মাধ্যমে দেখে নেয় যে যেটা পঞ্চমুখী বলছে সেটার ভেতরে পাঁচটা বীজ আছে কিনা। এছাড়াও রুদ্রাক্ষ পরীক্ষার কিছু সহজ উপায় আছে। চারিদিকে রুদ্রাক্ষ নিয়ে অতিরিক্ত জালিয়াতি হচ্ছে বলেই এত পরীক্ষা নিরীক্ষার কথা আসছে। তারপরে তাকে শুদ্ধিকরণ করারও অনেক পদ্ধতি আছে। ঘি দিয়ে ধোয়া, দুধ দিয়ে ধোয়া, তাকে রোদ্দুরে রাখা, একটু পালিশ করে নেওয়া — এভাবে নানা উপায়ে শুদ্ধিকরণ করে বিশেষ দিন ক্ষণে, হয়তো শিবের দিন সোমবারে ধারণ করার নিয়ম আছে।
সাধারণত ছেলেরাই রুদ্রাক্ষ ধারণ করে। দ্বিতীয়ত, যারা ব্রহ্মচর্য জীবন যাপন করে তাদের জন্যই রুদ্রাক্ষ ধারণ করা শ্রেয়। তবে ব্রহ্মচারী হলেই যে তাকে রুদ্রাক্ষ ধারণ করতে হবে তেমন কোন কথা নেই। যদি গুরুর নির্দেশ হয় তবেই ধারণ করা উচিত। রুদ্রাক্ষ ধারণ করলে ব্রহ্মচারীর শরীর সহজে উত্তেজিত হয় না। নানা রকম বিরুদ্ধ পরিবেশ ও পরিস্থিতির মধ্যেও সহজে তার কামের বিকার উৎপন্ন হতে পারে না অথবা হলেও রুদ্রাক্ষের কল্যাণে তাড়াতাড়ি প্রশমিত হয়ে যায়। আরেক দিক দিয়ে দেখলে তার কামের জাগরণ হলেও তার শ্বাস-প্রশ্বাসের গতি এবং হার্টবিটের তারতম্য হয় না। এটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ কারণ ওই করতে গিয়েই আমরা অনেক শক্তি ক্ষয় করে ফেলি। উত্তেজিত হয়ে গিয়ে আমাদের শরীরের মেটাবলিজমের স্পিড বেড়ে যায়। তখনই আসল ক্ষতি হয়। রুদ্রাক্ষ সেটা হতে দেয় না। সুতরাং রুদ্রাক্ষের আধ্যাত্মিক গুণাগুণ একজন সাধক ও ব্রহ্মচারীর জন্য প্রয়োজন বলেই এটা সাধকদের মধ্যেই পরার বিধান দেওয়া হয়।
[৩’রা নভেম্বর ২০২৪]