শ্রীশ্রীরামঠাকুর প্রথম জীবনে খুবই প্রচ্ছন্ন ছিলেন। তবু তার যোগবিভূতিগুলি ধীরে ধীরে জনসাধারণের চক্ষে প্রকটিত হয়ে পড়েছিল, এর কারণ তিনি নিজেই বলেছেন, “যাহারা মহাজন, যোগৈশ্বর্য্যগুলি তাঁহাদের পরিচর্য্যার প্রতীক্ষায় সর্বদাই সঙ্গে সঙ্গে থাকে। মহাজনরা সেদিকে দৃকপাত করেন না, কিন্তু কখনও কখনও কোন বিশেষ কারণে ঐ সকল যোগ-বিভৃতি প্রত্যক্ষ হইয়া পড়ে।”
ব্রহ্মঃ ঠাকুর বললেন, “ব্রহ্মের আবার দিগবিদিক কি? ব্রহ্ম সর্বদিকে বিরাজ করেন। যেইভাবে বসাইলে আপনি আনন্দ পান সেইভাবে বসান গিয়া। আনন্দ পাওয়া নিয়া কথা।” ফণীবাবু লিখেছেন, ঠাকুরের কথা বিচার করিলে দেখবেন ভদ্রলোক কৈবল্যনাথ বিগ্রহ বসাবেন, আর ঠাকুর বললেন ব্রহ্মের দিগবিদিগ নাই। ব্রহ্ম সকল দিকে আছেন। তা হলে বিচারে পাওয়া গেল ঠাকুর প্রকারান্তরে নিজেকে ব্রহ্ম বলে স্বীকার করলেন।
#নারায়ণঃ একজন প্রবীণ ভক্ত স্নান করে সিক্ত বসনে সচন্দন তুলসী হস্তে ঠাকুরের দিকে অগ্রসর হচ্ছেন লক্ষ্য করে ঠাকুর চরণ দু‘খানি প্রসারিত করে দিলেন। কিন্তু তিনি সচন্দন তুলসীপত্র নিয়ে ঠাকুরের নিকট যেয়ে হস্ত প্রসারণ করে ঠাকুরের বক্ষঃস্থলের নিকট নিতেই ঠাকুর প্রশ্ন করলেন-“এইগুলি কোনখানে দিবেন?” তিনি বললেন-“বাবা সচন্দন তুলসীপত্র আপনার বক্ষে দিব।” ঠাকুর চরণ দু-খানি দেখিয়ে বললেন, “তুলসীপত্রের স্থান নারায়ণের শ্রীদেহের অন্য কোথাও না। উহার স্থান নারায়ণের চরণযুগলে।” তা হলে বিচারে পাওয়া গেল ঠাকুর প্রকারান্তরে নিজেকে নারায়ণ বলে স্বীকার করলেন।
#শ্রী_হরিঃ চাঁদপুরে শ্রীশ্রীঠাকুর মোক্তার বসন্ত কুমার মজুমদার মহাশয়ের স্ত্রীর মৃত্যুর সময় তার শিয়রে দাড়িয়ে বলেছিলেন, “দেখেন আপনার শিয়রে স্বয়ং শ্রীহরি দন্ডায়মান।” তা হলে বিচারে পাওয়া গেল ঠাকুর প্রকারান্তরে নিজেকে শ্রীহরি বলে স্বীকার করলেন।
#গোবিন্দঃ “কৃপাসিন্ধু রামঠাকুর” গ্রন্থে শ্রীমনোরঞ্জন মুখুটি লিখেছেন, একদিন আমি ও প্রভাতদা ঠাকুরের সঙ্গে শা-নগর এক ভক্তের বাড়ী উপস্থিত হই। ভক্তপ্রবর দরজা খোলা মাত্রই ঠাকুর বললেন, “আজ আপনার দরজায় স্বয়ং গোবিন্দ উপস্থিত।” তা হলে বিচারে পাওয়া গেল ঠাকুর প্রকারান্তরে নিজেকে গোবিন্দ অর্থাৎ শ্রীকৃষ্ণ বলে স্বীকার করলেন।
#জগন্নাথঃ “কৃপাসিন্ধু রামঠাকুর” গ্রন্থে শ্রীমনোরঞ্জন মুখুটি লিখেছেন, “ঠাকুর একবার আমার সেজ ভ্রাতার কালির কারখানা, সদানন্দ রোডে অসুস্থ হয়ে গুপ্তভাবে অবস্থান করছিলেন। তখন নিজমুখে একদিন আমার সেজভাইকে বলেছিলেন-“আমিই জগন্নাথ।” তা হলে বিচারে পাওয়া গেল ঠাকুর প্রকারান্তরে নিজেকে জগন্নাথ বলে স্বীকার করলেন।
#গৌরাঙ্গদেবঃ “রামভাই স্মরণে”, ঠাকুরকে রাজসূয় যজ্ঞের মালসা ভোগ দিতে ভুলে যাওয়ায়, শ্রীশ্রীঠাকুর ভক্তবৃন্দের কাছে মালসা ভোগের নাম ও কাহিনী বলতে বলতে তন্ময় হয়ে ওঠেন এবং ভাবাবেশে বলেন, “আমিই গৌরাঙ্গদেব।” তা হলে বিচারে পাওয়া গেল ঠাকুর প্রকারান্তরে নিজেকে গৌরাঙ্গদেব বলে স্বীকার করলেন।
ফেনীতে প্রমথবাবুর বাসায় শ্রীশ্রীসত্যনারায়ণের পূজার পর ঠাকুর স্বাভাবিক অবস্থায় বার বার বলতে লাগলেন, “#আমিই_ত_সত্যনারায়ণ, আমিই ত সত্যনারায়ণ, আমিই ত সত্যনারায়ণ; শত শত ধারাল অস্ত্র নিক্ষেপ করিয়াও আপনাদের কেহই কিছু করিতে পারিবেনা।” তুলসীবাবুর এ সময় ঠাকুরের উক্তিটিও মনে পড়েছিল, “সৃষ্টিস্থিতি-প্রলয়ের কারণ পূর্ণব্রত সত্যনারায়ণ এই রামচন্দ্র।”
একদিন বোমা বর্ষণের সময় মাধবচন্দ্র মজুমদার মশাই ঠাকুরকে ট্রেনে যেতে অনুরোধ করলে #ঠাকুরমশাই_বলেছিলেন, “আমার মাথায় বজ্র পড়িবে,সেই বজ্র আজও তৈয়ার হয় নাই।”
সুতরাং দেখা যায় সমসাময়িক মহাপুরুষদের দৃষ্টিতে, কোন কোন ভাগ্যবান আশ্রিতবর্গের উপলদ্ধিতে এবং শ্রীশ্রীঠাকুরের শ্রীমুখের উক্তিতে তিনিই “#ষড়ৈশ্বর্য্যশালী_ভগবান।”
আমাদের মত সাধারণের কাছে তিনি পতিতপাবন রামঠাকুর। আমাদের মত পতিতদের উদ্ধারের জন্য তিনি পতিতপাবন রূপে দাঁড়িয়েছেন সমভূমিতে।
কিন্তু কেন তার এই প্রচ্ছন্নতা? - “পাছে আমরা অলৌকিকতার অন্তরালে সে অহৈতুকী কৃপাসিন্ধু স্বভাব প্রেমিক সহজ সরল মানুষটিকে হারিয়ে ফেলি, তাঁর ও আমাদের মধ্যে এক দুরতিক্রমণীয় ব্যবধান সৃষ্টি করি, বোধ করি সেজন্যই তিনি সতত নিজেকে প্রচ্ছন্ন রাখতেন।”
জয়রাম, জয়গোবিন্দ॥