অনেকদিন হইতেই ঠাকুর ভক্তদের বাড়ী বাড়ী ঘুরিয়া বেড়াইতেছেন, স্থায়ী ভাবে বসবাস করিবার মত কোন স্থান বা আশ্রম ছিল না। ঠাকুরের জন্য একটি আশ্রমের বিশেষ প্রয়োজন মনে করিয়া আশ্রিতগণ সর্বদাই এ বিষয়ে আলোচনা করিতেন। ঠাকুরের সঙ্গে করিয়া আশ্রিতগণ এই উদ্দেশ্যে নানা স্থানে ঘুরিয়া বেড়াইতেন, কিন্তু পছন্দমত আশ্রমের উপযুক্ত স্থান পাওয়া যাইতেছিল না। সবাই আশ্রম তৈয়ার করিবার জন্য আগ্রহাম্বিত, যিনি যেখানে আছেন, সেখানেই আশ্রমের জন্য স্থানের অনুসন্ধান করিতেছেন। আশ্রিতগণ ঠাকুরের সহিত আশ্রম প্রতিষ্ঠা সমন্ধে প্রায়ই আলোচনা করিতেন। অনেক শহর ঘুরিয়াও আশ্রমের উপযুক্ত কোন স্থান না পাওয়াতে সকলেই দুঃখিত ও চিন্তিত হইয়া পড়িলেন।
.
১৩৬৬ বঙ্গাব্দও (১৯২৯ খ্রিষ্টাব্দ) প্রায় শেষের দিকে, তখনও আশ্রমের উপযুক্ত জমি না পাওয়ায় ভক্তরা চিন্তিত। এমনি সময়, শ্রীশ্রীরামঠাকুর এসেছিলেন চাঁদপুরে শ্রীযুক্ত রোহিনী কুমার মজুমদার মশাইয়ের বাড়িতে। এ বাড়িতেই শ্রীশ্রীঠাকুর এক চিঠি পেলেন। চিঠি লিখেছেন, নিষ্ঠাবান ভক্ত শ্রীযুক্ত মনীন্দ্রকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি জানিয়েছেন, চট্টগ্রাম শহরের কাছে, পাহাড়তলীতে আশ্রম প্রতিষ্ঠার জন্য ছোট এক পাহাড় আছে। ওই পাহাড় স্বর্গত মহেন্দ্র ঘোষালের বিধবা স্ত্রী ঠাকুরকে দান করতে চান। চিঠি পাওয়ার দু-তিন দিন পর, শ্রীশ্রীঠাকুর রোহিণী বাবুকে সাথে করে এলেন চট্টগ্রাম। উঠলেন শ্রদ্ধেয় ভক্ত বিধুভূষণ বসু মশাইয়ের বাড়িতে।
.
শ্রীযুক্ত মনীন্দ্রকুমার বন্দ্যোপাধ্যায় তখন চট্টগ্রাম শহরের ইনকাম ট্যাক্স অফিসার। খবর পেয়েই, চলে এলেন বিধুভূষণ বাবুর বাড়িতে। ঠাকুরকে প্রণাম নিবেদন করে, দু-এক কথার পর জানালেন, মহেন্দ্র বাবুর সাথে তাঁর আত্মীয়তার সম্পর্ক আছে। সেই সুবাদে জেনেছেন স্বর্গত মহেন্দ্র ঘোষালের একান্ত ইচ্ছা ছিল, এক আশ্রম যেন প্রতিষ্ঠিত হয় ঐ পাহাড়ে। অকাল মৃত্যুতে তাঁর সেই সাধ অপূর্ণ থাকে। তাই মহেন্দ্র ঘোষাল মশাইয়ের পূণ্যবতী বিধবা স্ত্রী চপলা দেবী ও তাঁদের সুযোগ্য পুত্র নির্মল কুমার ঘোষাল, স্বর্গত মহেন্দ্র ঘোষাল মশাইয়ের ইচ্ছা পূরণের আশায়, আশ্রম প্রতিষ্ঠার জন্য ঐ পাহাড় শ্রীশ্রীঠাকুরকে দান করতে চান। ঠাকুর সমস্ত শুনে, একটু পরেই বলেছিলেন, দু-তিন দিন পর ঐ পাহাড় দেখতে যাবেন। শ্রীশ্রীঠাকুরের ঐ কথায় ঘরে যাঁরা ছিলেন সবাই খুব খুশী হলেন। চট্টগ্রাম, ফেনী, চাদঁপুরেও খবর পাঠানো হলো। খবর পেয়েই, ঠাকুরের সাথে পাহাড় দেখতে, ফেনীর অধ্যাপক প্রমথনাথ চক্রবর্তী ছাড়াও কয়েকজন ভক্ত এসে উঠলেন বিধুবাবুর বাড়িতে।
.
বহুদিন লোকজনের বাস না থাকায় পাহাড়টি জঙ্গলাকীর্ণ হইয়াছিল। ঠাকুর পাহাড়টি দেখিতে যাইবেন শুনিয়া শ্রদ্ধেয় ঁবিধুভূষণ বসু লোকজন দিয়া জঙ্গলগুলি পরিষ্কার করাইয়া দিলেন। একদিন বিকালবেলা শ্রদ্ধেয় ঁবিধুভূষণ বসু কয়েকজন আশ্রিত সহ ঠাকুরকে সেই পাহাড় দেখাইতে লইয়া গেলেন। বড় রাস্তা হইতে পাহাড়টির নিকটে গাড়ী পৌঁছিবার মত কোন ভাল রাস্তা না থাকায় ঠাকুরকেও ঊনাদের সহিত পদব্রজে পাহাড়ের নিকট পৌঁছিতে হইয়াছিল। ঠাকুর পাহাড়টিতে পাঁচ-ছয় পা উঠিয়া চতুর্দিক অবলোকন করিলেন এবং ফিরিয়া পাহাড়ের তলদেশে একটি বটবৃক্ষের মূলে উপবেশন করিলেন। এই বটবৃক্ষই “কৈবল্যশক্তি” নামে অভিহিত হইয়াছে। গুরুভ্রাতারা সকলেই চতুর্দিক ঘুরিয়া ঘুরিয়া দেখিতেছিলেন। গ্রীষ্মকাল, সবে মাত্র বসন্ত শেষ হইয়াছে। প্রতিটি গাছের পাতায় পাতায় সবুজ লাগিয়াছিল। পাহাড়ের চারিদিকে ফল ও ফুল গাছের অন্ত নাই, আমগাছ আম্রভরে ছিল নত, জামগাছে ছিল অফুরন্ত জাম, বেলগাছের মাথায় মাথায় বেলের অন্ত ছিল না। লিচু, পেয়ারাও কুলগাছ ছিল অনেক। গাছেরও ছিল না অন্ত, ফলেরও ছিল না শেষ। ফুলগাছেও ফুল ছিল অপর্যাপ্ত, অপরূপ শোভায় শোভিত হইয়া আপন গন্ধে আমোদিত করিয়া দিয়াছিল। এ ছাড়াও অনেক রকমের গাছ থাকায় ঐ স্থানটিকে অলকানন্দার তীরে নন্দন কানঙ্কেই মনে করাইয়া দিতেছিল। আশেপাশে আরও অনেক ছোট-বড় পাহাড় দেখা যাইতেছিল, মনে হইল যেন “থরে থরে বিথরে বিথরে বিরাজিছে গিরিরাজি”।
.
শ্রদ্ধেয় গুরুভ্রাতাগণ পাহাড়ের উপর উঠিয়া দেখিলেন বেড়াশূন্য একখানি চৌচালা টিনের ঘরের মধ্যস্থলে একটি বেদী বিদ্যমান। স্থানটিতে একজন সাধু থকিতেন। কালক্রমে ঐ সাধুর এই স্থান পরিত্যাগের পরে পাহাড়টি এই ভাবে পড়িয়া রহিয়াছে। চতুর্দিকের দৃশ্যও অতীব মনোরম। পাহাড়টির অতি নিকট দিয়া রেল লাইন গিয়াছে, মনে হইল যেন দুইটি সমান্তরাল রেখা বহু দূর চলিয়া গিয়াছে। অনেক দূরে সমুদ্র দেখা যাইতেছিল, অসীম সমুদ্রের নীল জলরাশি মাঝে মাঝে ফুলিয়া গর্জিয়া উঠিতেছে, আপন গতিবেগে আবার শান্ত হইয়া যাইতেছে। কভু বা শান্ত, কভু অশান্ত, আপন ছন্দে চলে। ঐ জলরাশির উপর দিয়া বহু নৌকা ও জাহাজ চলাচলের দৃশ্যও মনোরম। সূর্যদেবের অস্তাচলে যাওয়ার দৃশ্যও সে দিন মনে হইল যেন সারাদিনের পরিশ্রমের পরে সূর্যদেব শ্রান্ত-ক্লান্ত দেহে সমুদ্রের শীতল জলে অবাহগন করিতে চলিয়াছেন।
.
পাহাড়টিও সমুদ্রের মধ্যবর্তী স্থানে ছিল সবুজ মাঠ ও ছোট ছোট গ্রাম। গ্রামগুলির মধ্যে কাঠটুলি অন্যতম। গ্রামগুলি সবই বড় বড় বৃক্ষরাজির সবুজ পাতায় ঢাকা। নানা রকম পাখির কলতানে চারিদিক ছিল মুখর। প্রকৃতির সকল রকম সৌন্দর্যের বস্তুই ঐখানে বিরাজ করিতেছিল। উপস্থিত সকলেই মনে মনে ঠিক করিলেন এই পাহাড়টিই আশ্রমের উপযুক্ত স্থান, ঠাকুর নিশ্চয় ঐ স্থানটি পছন্দ করিবেন। ঐ পাহাড়ের তলদেশে আবদুল নামে একজন মুসলমান ভদ্রলোক সপরিবারে বাস করিতেন। আবদুল সেখানে উপস্থিত হইলে ঠাকুর তাঁহাকে এমনভাবে আলিঙ্গন করিলেন, মনে হইল আবদুল তাঁহার বহু দিনের পরিচিত। ঠাকুর আবদুলকে বলিলেন, “এই স্থানেই আশ্রম প্রতিষ্ঠিত হইবে, আশ্রমের সমস্ত কায্যে আপনি ভক্তদের সাহায্য করিবেন, এই আশ্রমের ভালমন্দের দিকে লক্ষ্য রাখিবেন।” আবদুল নতমস্তকে ঠাকুরের আদেশে সম্মতি জ্ঞাপন করিলেন।
.
অবশেষে আশ্রমের জন্য এই স্থানটি শ্রীশ্রী ঠাকুরের পছন্দ হইয়াছে জানিয়া সকলের কি আনন্দ। আশ্রিতরা সবাই ঠাকুরের সাষ্টাঙ্গ প্রণিপাত করিলেন, পরে সবাই ঠাকুরের সঙ্গে চট্টগ্রাম শহরে শ্রদ্ধেয় ঁবিধুভূষণ বসুর বাড়ীতে ফিরিয়া আসিলেন।
