মাঝে মাঝে বলছেন, ''আমি আর সহ্য করতে পারি না।" এক একবার ঠাকুর "মাগো" আমি আর কত কষ্ট পাবো"

 


আশ্রিতের সুখের জন্যে অনেক ব্যাধিকে নিজের শরীরে আশ্রয় দিয়ে তিনি কতই না কষ্ট ভোগ করেছেন।মনে পড়ে একবার ঠাকুর ক'দিন ধরে খুবই অসুস্থ।সারাদিনে দু'তিনটি ডাব আর একটু দুধ ছাড়া আর কিছুই গ্রহণ করেন না।পেটে ভীষণ ব্যথা।বেলেঘাটা থেকে কৈলাসবাবু এলেন।তিনি এলোপ্যাথ ডাক্তার,তিনি আসতেই ঠাকুর তাকে বললেন যে হোমিওপ্যাথিক ওষুধে তাঁর কিছুই হয় নাই।তাই তাকেই ওষুধের ব্যবস্থা করতে বললেন।


কৈলাসবাবু পরীক্ষা করে ঔষুধ দিলেন।কিন্তু তাতে কোন ফলই হলো না,বরং ক্রমে ক্রমে যন্ত্রণা ভয়ানক রকম বেড়ে গেল।ঠাকুরকে এত কষ্ট পেতে আমি আর কখনও দেখিনি,ঠাকুর একবার বসছেন,শুচ্ছেন কখনও  বা খালি মেঝের ওপর গড়াগড়ি দিচ্ছেন।মাঝে মাঝে কাঁদছেনও।ঘরে যারা আছেন তাদের ঠাকুর মাঝে মাঝে বলছেন, ''আমি আর সহ্য করতে পারি না।" এক একবার ঠাকুর "মাগো" আমি আর কত কষ্ট পাবো" বলছেন।তাঁর এইরকম কাতরোক্তি শুনে সকলেই অঝোরে কাঁদছে।


কিন্তু কেউই তাঁর যন্ত্রণার কোন উপশম করতে পারছেই না।কর্ত্তা (ঁকুঞ্জবাবু) ইতিমধ্যে ডাক্তার দাশগুপ্তকে খবর পাঠিয়েছেন।ডাক্তারবাবু এসেছেন,কিন্তু ঠাকুর ডাক্তারবাবুকে তাঁর সামনে আসতে বারণ করেছেন।তাই তিনি ঠাকুরের সামনে আসতে পারছেন না।ডাক্তারবাবু এসে পাশের ঘরে বসে আছেন।ঠাকুরকে জানানো হলো যে ডাক্তারবাবু এসেছেন,কিন্তু তিনি ভরসা করে আসতে পারছেন না।


ঠাকুর বললেন, "আসছে যখন দেইখা যাউক।এইখানে আসতে বলেন।" দীর্ঘকাল পরে ডাক্তারবাবু ঠাকুরের সামনে আসার অনুমতি পেলেন।অনেকদিন ধরেই ডাক্তারবাবু আসেন,অথচ ঠাকুরের দর্শন পান না,তিনি এসে অন্য কোন ঘরে বসে থাকেন,প্রসাদ গ্রহণ করেন,তারপর চলে যান।আজ এতকাল পরে দর্শনের অনুমতি পেয়েছেন।অথচ ঠাকুরের এই অবস্থা।


আনন্দে,দুঃখে ডাক্তারবাবুর দু'চোখ বেয়ে দরদর করে জল পড়তে লাগলো।ডাক্তারবাবুর মুখ দিয়ে আর কোন কথা বেরোলো না।তিনি ঠাকুরের পা ধরে আকুলভাবে কাঁদতে লাগলেন।কিছুক্ষণ ঘরের সকলেই স্তব্ধ হয়ে রইলো।ঘরের স্তব্ধতা ভেঙ্গে ঠাকুর ডাক্তারবাবুকে বললেন, "বড়ই কষ্ট পাইতেছি।কৈলাসবাবু ওষুধ দিচ্ছেন,কিছু হইলো না।" কিছুক্ষণ পর ঠাকুর কৈলাসবাবুকে বললেন, "কৈলাসবাবু একটু ভালো ওষুধের ব্যবস্থা কইরা দেন।"

তারপর ডাক্তার দাশগুপ্তকে বললেন, "ডাক্তারবাবু,আপনে লেখেন।" দু'জনেই চুপচাপ, কৈলাসবাবুকে ওষুধের ব্যবস্থা করতে বললেন,আর ডাক্তারবাবুকে লিখতে বললেন।


ডাক্তার দাশগুপ্তও ঠাকুরের কথামতো কাগজ কলম নিয়ে বসলেন,কৈলাসবাবু চুপচাপ।এখানে একটু না বললে ব্যাপারটা বুঝতে অসুবিধা হবে।ডাক্তার দাশগুপ্ত ইউরোপ ঘুরে আসা লব্ধপ্রতিষ্ঠ প্রবীণ চিকিৎসক।কৈলাসবাবু কর্পোরেশনের ডাক্তার,প্রাইভেট প্র‍্যাকটিস অতি সামান্য।কৈলাসবাবু ওষুধ স্থির করবেন,আর ডাক্তার দাশুগুপ্ত তা লিখবেন, এটাতে কৈলাসবাবু আর ঘরের সকলেই হতভম্ব হয়ে রইলেন।


ডাক্তারবাবু কলম নিয়ে প্রস্তুত হয়ে আছেন,কৈলাসবাবু বললেই লিখবেন।ঠাকুর আবার কৈলাসবাবুকে বললেন, "আপনে বলেন", আর ডাক্তার দাশগুপ্তকে বললেন, "আপনে লেখেন"।এবার যেন সকলের চমক ভাঙ্গলো।কৈলাসবাবু ওষুধের নাম বললেন,আর ডাক্তার দাশগুপ্ত তা লিখলেন।কে জানে ডাক্তার দাশগুপ্তের মধ্যে ঠাকুর হয়ত কোন অহমিকা দেখতে পেয়েছিলেন,তাই তা নির্ম্মূল করার জন্য ঠাকুর এমন করলেন।


ডাক্তার দাশগুপ্ত নিজে অনেক সময় অনেকের কাছে এই ঘটনার উল্লেখ করে বলেছেন, যে তার ডাক পড়তেই তিনি মনে মনে আত্মপ্রসাদ বোধ করলেন,কৈলাসবাবু আর কি চিকিৎসা করবেন,হয়ত বা এ চিন্তাও মনে চাড়া দিয়েছিল।ঠাকুরকে তো আর ফাঁকি দেওয়া যায় না,তিনি সঙ্গে সঙ্গেই দর্প চূর্ণ করে দিলেন।কখনও কখনও ঠাকুর ডাক্তারবাবুকে কটু কথা বলেছেন।ডাক্তার দাশগুপ্ত অতি প্রসন্নচিত্তে ঠাকুরের এই রকম বকার কথা বলেন-ডাক্তারবাবুর মতে ঠাকুরের বকা মানে,আশীর্ব্বাদ।


ঠাকুরের আদরও ডাক্তারবাবু বহু পেয়েছেন,যেমন আদর সংসারে কল্পনাতীত।এই সংসারে আমি" টা কি আর সহজে যেতে চায়,সুযোগ পেলেই চাড়া দিয়ে ওঠে। বাইরে প্রকাশ না পেলেও মনের ভেতর এই কালীয়নাগ ফণাবিস্তার করে ওঠে। তখন কালীয়দমন ছাড়া আর কেউ কি তাকে দমন করতে পারে? ঠাকুরের বকাঝকা এই কালীয়দমন।

Post a Comment

Please Select Embedded Mode To Show The Comment System.*

Previous Post Next Post