● শিলং এর জঞ্জালপূর্ণ পাইনবন উপাখ্যান ●

 

        -  শ্রীশ্রীরামঠাকুর প্রসঙ্গে,

        শ্রীশ্রীঠাকুর একবার অতিরিক্ত গরমে ঢাকায় অসুস্থ হয়ে পড়লে, সেখানকার চিকিৎসকরা তাঁর বায়ু পরিবর্তনের পরামর্শ দিয়ে বললেন যে কোন স্বাস্থ্যকর স্থানে কিছুদিনের জন্য নিয়ে গেলেই তিনি সুস্থ হয়ে উঠবেন। সেই মত উপস্থিত পার্ষদগন শ্রীশ্রীঠাকুরকে শিলং পাহাড়ে নিয়ে যাওয়া মনস্থ করলেন। শ্রীশ্রীঠাকুর এই সিদ্ধান্তে খুশি হলেন। তিনি বললেন যে সেখানে ভাল তরিতরকারি, টাটকা ফলমূল পাওয়া যাবে তাছাড়া যেতে পারবেন তাঁর একান্ত কাঙ্ক্ষিত জঞ্জালপূর্ণ পাইনবন গুলিতে। ফণীবাবু জঞ্জালপূর্ণ পাইনবনের ব্যাপারটা লক্ষ্য করে শ্রীশ্রীঠাকুরকে জিজ্ঞাসা করতে তিনি বললেন, শিলং গেলেই বুঝা যাবে, কাজ করার পূর্বে ওসব জানাতে নেই। 


        শিলংএ পৌঁছে একমাসের জন্য হোটেলে ঘর ভাড়া নিলেন তাঁরা। অভ্যাসমত শ্রীশ্রীঠাকুর সবাইকে নিয়ে সেখানে প্রতিদিন বিকেলে বেড়াতে বের হতে লাগলেন।  দিনকয়েক পর পূর্ব নির্ধারিত জঞ্জালপূর্ণ পাইনবনে যাবার জন্য সকলে তৈরী হলেন এবং শ্রীশ্রীঠাকুরের অনুগমন করে যথাস্থানে পৌঁছুলেন। সেখানে ওনার আদেশে খুব উচ্চৈঃস্বরে তারকব্রহ্ম নাম কীর্তন করলেন সকলে। এই ভাবে একে একে দশটি পাইনবন ঘোরা শেষ হল। 


        ইতোমধ্যে একমাস শেষ হয়ে এল। শ্রীশ্রীঠাকুর শারীরিক ভাবে সুস্থ। শেষ দিন মধ্যাহ্ন ভোজনের পর সমস্ত পার্ষদ উপস্থিত হলেন শ্রীশ্রীঠাকুরের ঘরে। ফণীবাবুর হাতে নোট বই ও কলম দেখে, কিছু বলার পূর্বে তিনি নিজেই পাইনবন উপাখ্যানের কথা তুলে সেই প্রসঙ্গে বলতে আরম্ভ করলেন। শ্রীশ্রীঠাকুর বলছেন আর ফণীবাবু  তাঁর নোট বইতে লিখতে থাকেন সেই সব অমৃত কথন। ----- 


        ----- তারপর রবিবার দ্বিপ্রহরে আহারান্তে ঠাকুরের নিকট যাইয়া বসিতেই ঠাকুর হাসিয়া বলিলেন, আজ বুঝি পাইন বন উপাখ্যান। আমি নোট বই ও কলম হাতে লইয়া বলিলাম, " জঞ্জালপূর্ণ পাইন বনের কাহিনী শুনতে এসেছি। আমি যে এসেছি, তুমি জানতে পারলে কি ভাবে ?" 


        উত্তর - তোমার অন্তরভাব দেইখা। 


        প্রশ্ন - শিলং-এ পাইন বৃক্ষের বহু বাগান আছে ? 


        উত্তর - আছে বই কি ? 


        প্রশ্ন - তার মধ্যে দশটি বাগানে আমাদের নিয়ে গিয়ে নাম কীর্তন করিয়েছিলে। নির্জন, নিরালা পাইন বাগানে কীর্তনের কি প্রয়োজন ছিল? 


        উত্তর - নিশ্চয় প্রয়োজন ছিল। তারকব্রহ্ম ১৬ নাম ৩২ অক্ষর হরে কৃষ্ণ রাম হইল প্রণবের তিনটি অবয়ব অ উ ম। অর্থ হইল তন্ময়তার সঙ্গে হরিনামে রমণ করা। প্রণব কীর্তনের ফল সর্বত্র, সর্বকালে সমভাবে হইয়া থাকে। তারতম্য কিছু নাই। যেমন, অমৃত পানে স্বাদ তিক্ত, কষা, কটু, মিষ্ট যেমনই লাগুক, অমৃত অমৃতের ফল দিবেই। সেইরূপ এই নাম করতে ভাল, মন্দ, রুচি, অরুচি, যেমন লাগুক না কেন, নাম নামের ফল অবশ্য দিবে। এই কীর্তন শ্রবণে বৃক্ষ, তরু, লতা, কীট, পতঙ্গাদি সকল জীবের উন্নত অবস্থা প্রাপ্তি হয়। 


        প্রশ্ন - ঐ দশটি বাগানকে লক্ষ্য করেই জঞ্জালপূর্ণ বলেছিলে ? 


        উত্তর - হ তাই। 


        প্রশ্ন - কেন ? শিলং-এ আরও বহু পাইন বাগান রয়েছে। 


        উত্তর - থাকলে কি হইব ? শুধু ঐ বাগানগুলিতেই হাজার হাজার বিদেহী আত্মা আশ্রয় নিছিল। তাগ মধ্যে ভাল, মন্দ রকম ফের আছে। তোমরা যেমন সৎ সৎলোকের সঙ্গে, মন্দ মন্দলোকের সঙ্গে মিশা থাকতে ভালবাস, তাগ বেলায়ও সেই রকম। তারা তাগ অবস্থান্তর প্রাপ্তির জন্য সর্বদা আইসা কাকুতি-মিনতি জানাইত। 


        প্রশ্ন - আমাদের কীর্তনের ফলেই বিদেহী আত্মাগুলির অবস্থান্তর প্রাপ্তি ঘটে ? 


        উত্তর - নিশ্চয়। নামের অসীম ও অমোঘ শক্তি। অসম্ভব সম্ভব করতে পারে একমাত্র নামে। 


        প্রশ্ন - মানব দেহত্যাগের পর সকলকেই কি বিদেহী অবস্থায় থাকতে হয় ? নাকি কেউ কেউ সঙ্গে সঙ্গে পুনরায় মানব জন্ম পায় ? 


        উত্তর - পূর্বজন্মের কৃতকর্মের ফল অনুযায়ী বিধান করেন ভবিতব্য। 


        প্রশ্ন - ভবিতব্যই কি ভগবান্ ? 


        উত্তর - না, ভবিতব্য ভগবান্ নন। জীবের জন্মান্তরীণ কর্মফল অনুযায়ী জন্ম, কর্ম ও মৃত্যুর বিধায়ক ভবিতব্য। ভবিতব্যের আশ্রয়ে থাকতে ভগবৎ প্রাপ্তি ঘটে না। মায়াচক্রের অধীন থাইকা ভবিতব্যের হাত এড়ান যায় না। গতাগতি ঘুচলে ভবিতব্য থাকে না, ভগবৎ সন্নিধানে যাওয়া যায়। 


        প্রশ্ন - শুনেছি আত্মা নিত্য শুদ্ধ, নিত্য মুক্ত। তবে কেন আত্মার এত বিকৃত অবস্থা ঘটে ? 


        উত্তর - আত্মার বিকৃত অবস্থা কখনও হয় না। আত্মা সর্বকাল এক অপরিবর্তনশীল অধিকৃত অবস্থায় বিরাজ করে। আত্মার বিকৃত অবস্থা বইলা যা মনে হয় তা আত্মার নয়। আকাশে সূর্যেরে একখান ঘন কৃষ্ণ মেঘে আচ্ছাদিত করলে সূর্যের স্বীয় চিরন্তন অবস্থার যে রকম কোন পরিবর্তন হয় না, সেই রকম আত্মা, প্রকৃতিজাত মন, বুদ্ধি, অহঙ্কার, দশ ইন্দ্রিয় দ্বারা আচ্ছাদিত হইলেও আত্মা স্বীয় অপরিবর্তনীয় অবস্থায় বিরাজ করে। আবৃত অনাবৃত সকল অবস্থায় আত্মা অবিকৃত। বিকৃত অবস্থা হয় মনের। আবরণ শূন্য নাম দ্বারা  এই মনেরে মুক্ত করতে হইব। তখন জন্ম-মৃত্যুর অতীত অবস্থা পাইয়া আত্মা মুক্ত হইয়া যায়। 


        প্রশ্ন - পাইন বাগানের বিদেহী আত্মাসকল মুক্ত হয়ে গিয়েছে কি ? 


        উত্তর - যেই অবস্থায় ছিল সেই থাইকা উন্নত অবস্থা প্রাপ্ত হইছে। মুক্তি সাধনসাধ্য। 


        প্রশ্ন - উন্নত অবস্থায় গিয়ে সাধন করতে হবে ? 


        উত্তর - নিশ্চয় করতে হইব। নতুবা মুক্তি মিলব কি প্রকারে ? মুক্তি কি গাছের ফল যে কুড়াইয়া নিলেই মুক্তি মিলব ? 


        প্রশ্ন - তাহলে অজামিল নামাভ্যাসে বৈকুন্ঠ লাভ করেছিল কিভাবে ? সাধন করে নি তো ? 


        উত্তর - অজামিল নাম সাধন না কইরা শুধুমাত্র নামের আভাসেই বৈকুন্ঠাবস্থা লাভ করছিল। বৈকুন্ঠ বলে কারে ? বি কুন্ঠ বৈকুন্ঠ। নাই কুন্ঠ অর্থাত কুন্ঠাহীন, দ্বিধাহীন, সংকোচহীন অবস্থা লাভ না করলে ভগবৎ সকাশে যাওয়া যায় না। দ্বিধা, সংকোচও অষ্টপাশে গন্ডিবদ্ধ। অষ্টপাশের অষ্ট অবস্থা অতিক্রম কইরা তবে মুক্ত অবস্থা, জন্ম-মৃত্যুর অতীত অবস্থা নাম সাধনের দ্বারা লাভ করা যায়। অজামিলও সংকোচহীন অবস্থা লাভ কইরা পরে নাম সাধন কইরা মুক্তি পাইছিল। 


              🌸  জয় রাম  🌸 

     ¤    ¤    ¤    ¤    ¤    ¤    ¤    ¤

   ' রামভাই স্মরণে '

    শ্রী ফণীন্দ্রকুমার মালাকার ।

    ( পৃঃ ৬৮ - ৭০ )



Post a Comment

Please Select Embedded Mode To Show The Comment System.*

Previous Post Next Post