ষাট বছরের কিছু আগের ঘটনা।
ঠাকুরমহাশয়ের চোখে ছানি পড়েছে।দু'চোখেই ছানি আছে,একটাতে একটু বেশী,অন্যটায় কিছু কম।আশ্রিতদের মধ্যে যাহারা বুঝতে পেরেছেন তাহাদের চিত্তে ভীতির সঞ্চার হয়েছে,ভাবছেন পরিপূর্ণ নয়ন দু'টির আর তো এমন প্রসন্ন দৃষ্টিপাত তাদের উপর পড়বে না।
দু'চারজন সুবিধা বুঝে ঠাকুরমহাশয়ের কাছে অনুমতি চাইলেন চিকিৎসার ব্যবস্থা করার।মৃদু হেসে তখন ঠাকুরমহাশয় তাদের নিরস্ত করেছিলেন এই বলে,দেহ থাকলে আধিব্যাধির আক্রমণ সহ্য করতে হবেই।তারজন্য এত ব্যস্ত হওয়ার আমি তো কোন কারণ দেখি না।নানান স্থানের আশ্রিতদের এইরকম কাতর অনুরোধ এসেছে কয়েক শত কণ্ঠ থেকে।ঠাকুরমহাশয় নিরুত্তাপ।সস্নেহে তাদের চিন্তা করতে নিষেধ করেছেন বারংবার।
ইতিমধ্যে বছর দুই তিন অতিবাহিত হয়ে গিয়েছে।ঠাকুরমহাশয়কে না জানিয়ে ডাঃ যতীন্দ্রমোহন দাশগুপ্ত মহাশয় কয়েকজন চক্ষু চিকিৎসককে নিয়ে গিয়ে উপর উপর চক্ষু পরীক্ষা করিয়েছিলেন ঠাকুরমহাশয়ের অজান্তেই।কলকাতার সেকালের সুপ্রসিদ্ধ চক্ষু চিকিৎসক ডাঃ কিরণ সেন মহাশয়ও বার দু'তিন একটু দূর থেকে ঠাকুরমহাশয়ের চোখের ছানির অবস্থাটা দেখে গিয়েছেন।পরে তিনি ডাঃ দাশগুপ্তকে বলেছিলেন,একটা চোখের ছানি কাটার সময় হয়েছে।
পরেরদিন থেকে ডাঃ দাশগুপ্ত সকালে-বিকেলে ঠাকুরমহাশয়ের কাছে যেতেন আর প্রণাম করে ঠাকুরমহাশয়ের চরণ ছেড়ে দিতেন না।করুণ-কাতর-স্বরে শুধু ছানি কাটার অনুমতি চাইতেন।উত্তরে ঠাকুরমহাশয় বলেছিলেন যে,তিনি সারাজীবনে এক পয়সাও উপার্জন করতে পারেননি।অস্ত্রোপচারের এই ব্যয়ভার ডাঃ দাশগুপ্ত বহন করবেন,এটা কি তিনি অনুমোদন করেন! ক্রন্দনরত ডাঃ দাশগুপ্ত তখন জানিয়েছিলেন যে তিনি দু'টাকা ফি-এর ডাক্তার হওয়ার যোগ্য নন,শুধু ঠাকুরমহাশয়ের কৃপায়ই তার ফি চৌষট্টি টাকা।তথাপি ঠাকুরমহাশয়ের সম্মতি লাভ ঘটেনি সে সময়।পরে কয়েকজন ঠাকুরের আশ্রিতের সম্মিলিত অনুরোধে ঠাকুরমহাশয় সম্মত হলেন ছানি কাটানোয়।উপস্থিত সকলের মুখই অনেকটা আনন্দোজ্বল হয়ে উঠল।
ডাঃ দাশগুপ্ত নিজগৃহে ৮৭ সংখ্যক বালিগঞ্জ প্লেসে প্রশস্ত ঘরে অস্ত্রোপচার হবে বলে স্থির করেছিলেন; কিন্তু সেই সিদ্ধান্ত তিনি পরিবর্ত্তন করতে বাধ্য হয়েছিলেন এই ভেবে যে,ঠাকুরমহাশয়ের অস্ত্রোপচারের কথা জানাজানি হয়ে গেলে বহু নর-নারী আসবেন তাঁহার দর্শনের জন্য।পূর্ব অভিজ্ঞতা থেকে তিনি জানতেন ঠাকুরমহাশয় ডাক্তারের নির্দেশ উপেক্ষা করে আগন্তুকদের গৃহের সকলের কুশল জিজ্ঞাসা করবেন খুঁটে খুঁটে।
তাই তিনি শরৎ বোস রোডের পূর্বদিকের এক গলিতে নব নির্মিত একটি দ্বিতল গৃহ ভাড়া করলেন।তিন চারজন ঠাকুরের আশ্রিত জনের সঙ্গে তিনি গোপনে পরামর্শ করলেন যে,অস্ত্রোপচারের অন্ততঃ এক মাসের মধ্যে যেন তারা ছাড়া আর কেউ এই খবর না জানতে পারেন।নিজে তিনি দৃঢ় ছিলেন,সহধর্মিণী ও নিজ পুত্র-কন্যাদের কাছেও গোপন করলেন অস্ত্রোপচারের কথা।
নির্দিষ্ট দিন সময় মত এলেন ডাঃ কিরণ সেন,সঙ্গে এলেন পৌঢ়া আ্যাংলো ইন্ডিয়ান একজন নার্স।ঠাকুরমহাশয় শয্যায় শয়ন করলেন।অস্ত্রোপচারের অস্ত্র ধুয়ে পুঁছে পরিষ্কার হয়েছে কিছুক্ষণ আগে।ডাঃ দাশগুপ্ত পাশের ঘরের জানালার ধারে দাঁড়িয়ে রইলেন কারণ তিনি সহ্য করতে পারবেন না ঠাকুরমহাশয়ের চক্ষে অস্ত্র চালানো।অঝোরে তিনি কাঁদছেন শঙ্কিত বক্ষে জানালার শিক ধরে।ডাঃ সেন শায়িত ঠাকুরমহাশয়ের ঝুঁকে পড়ে নিম্ন স্বরে বললেন,এই চোখটা আপনি একটু চোখের দুই পাতা তুলে প্রসারিত করুন।তাতে অস্ত্রোপচারের পক্ষে বিশেষ সহায়ক হবে।চোখের পাতায় হাত না দিয়েই ঠাকুরমহাশয় চোখ প্রশস্ত করলেন।ঝন...ঝন...ঝনাৎ...নার্সের হাত থেকে সমস্ত অস্ত্র সশব্দে পড়ে গেল,সঙ্গে সঙ্গে নার্স ভুলুন্ঠিতা হলেন।ডাঃ কিরণ সেন সারা দেহে সঘন কম্পন অনুভব করছেন,এই বুঝি নার্সের মত তিনিও ভূপতিত হন।ঠাকুরমহাশয়ের প্রসারিত চোখটি প্রায় আকর্ণ বিস্তৃত।মানুষের পক্ষে সহ্যের অতীত।ডাঃ সেন তখন ঠাকুরমহাশয়কে বললেন,অতটা বড় করবার দরকার নেই।সঙ্গে সঙ্গে ঠাকুরমহাশয়ের চোখটি স্বাভাবিক হল।উঠে বসলেন ঠাকুরমহাশয়।চীৎকার করে ডাকলেন,যারা এ ঘর থেকে সরে গিয়েছিলেন তাদের।ফিরে আসতে তাদের বললেন,নার্স মায়ের চোখে মুখে জল দেন আর চা তৈরী করে সকলে খেয়ে নিন পরে অস্ত্রোপচার হবে।
নার্স সুস্থ হয়ে বসলেন।কিন্তু তারও দুই চোখে নেমে এসেছে ভীতির চিহ্ন।ডাঃ দাশগুপ্তও চা পান করলেন ঐ ঘরে বসেই।ধীরে ধীরে ডাঃ সেন ফিরে পেলেন তার দৈহিক বল।নিপুণ হস্তে পরিষ্কার করে দিলেন এক চোখের ছানি।ব্যান্ডেজ বাঁধতে হয়েছিল দুই চোখেই আস্তে আস্তে এবং নিপুণ হস্তে।
ডাঃ দাশগুপ্ত ঠাকুরমহাশয়কে "বাবা" বলে ডাকতেন।তাতেই ডাঃ কিরণ সেন পিতা-পুত্র বলেই মনে করতেন।অস্ত্রোপচারের পূর্বে ঠাকুরমহাশয়ের প্রায় আকর্ণ বিস্তৃত চক্ষুকে প্রসারিত করা দেখে একটু সন্দেহের উদ্রেক হয়েছিল।প্রতিদিনই তিনি আসতেন ব্যাণ্ডেজ খুলে চোখ পরিষ্কার করতে এবং পুনরায় ব্যান্ডেজ বেঁধে দিতে।সেদিন ব্যান্ডেজ বাঁধার পর ডাঃ সেন মহাশয় সরাসরি ডাঃ দাশগুপ্তকে প্রশ্ন করে বসলেন,ঠাকুরমহাশয়ের সম্পর্কে যে,কে তিনি? কুন্ঠিত কন্ঠে ডাঃ দাশগুপ্ত বললেন,সে তো আমি ঠিক জানি না,বলব ভাই আমি কী করে?হাত ধরে তিনি ডাঃ সেনকে নিয়ে গেলেন পাশের ঘরে।সেখানে চা পান করার সময় দু'জনের মধ্যে আরম্ভ হয়েছিল ঠাকুর প্রসঙ্গ।যখন ছেদ পড়ল তখন বেলা অনেক।প্রায় মাসবধিকাল ঠাকুরমহাশয় ছিলেন ঐ বাড়িতেই।পরে ডাক্তারবাবু তাঁহাকে নিয়ে গিয়েছিলেন স্বগৃহে।সেখানেও কিছুকাল কাটিয়েছিলেন।ব্যান্ডেজ খুলে দেওয়ার দু'চার দিন বাদে ঠাকুরমহাশয় অল্প দামের সুতির চাদরখানা গায়ে জড়িয়ে নিলেন এবং বললেন যে, "আমি আসি গিয়া।" বাড়ির সকলের অনুরোধ যে তিনি উপেক্ষা করছেন সেটা নিতান্ত নিরুপায় হয়ে।তাঁর জন্য তারা যেন আর ক্লেশ ভোগ না করেন।সেদিনই তিনি রওনা দিয়েছিলেন পূর্ববঙ্গের কোনও গ্রামে মৃত্যুশয্যায় শায়িত একজন আশ্রিতের শয্যা পাশে উপস্থিত হওয়ার জন্য।
জয় রাম জয় গোবিন্দ।
